রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা, বেতন–ভাতাসহ যেসব সুবিধা দেওয়া হয়
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২০-০৮-২০২৬ ০৬:০৫:৩১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২০-০৮-২০২৬ ০৬:০৫:৩১ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি। সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।
তাই রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক গুরুত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ হলেও বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ৬ সংসদ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য প্রার্থী দেওয়ায় এবার ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ হয়েছে। আর ভোটগ্রহণ শেষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। তার নামেই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত রাষ্ট্রপ্রধানের, সরকারপ্রধানের নয়। ফলে রাষ্ট্রপতির পদটির মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব যতটা, নির্বাহী ক্ষমতা ততটা নয়। এখন অনেকের কৌতূহল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু এবং তিনি কী কী সুবিধা পান?
সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে বঙ্গভবনের মতো বিশাল সরকারি বাসভবন, বেতন-ভাতা, পরিবহন, চিকিৎসা, আপ্যায়নসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। পদ ছাড়ার পরও সাবেক রাষ্ট্রপতিরা কিছু সুবিধা পান।
দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য নন। একটি হলো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কে সরকার গঠন করতে পারবেন, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না বা দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারে না।
দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা
রাষ্ট্রপতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করার ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে এ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মার্জনা বা কমাতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তি রয়েছে। তার কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাকে গ্রেফতার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।
তবে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে অপসারণের বাইরে নন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাকে অভিশংসন করা যায়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাকে অপসারণের বিধান রয়েছে।
অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে তার পদ শূন্য হয়।
শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘটনা। ২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি পদত্যাগ করেন।
মেয়াদ পাঁচ বছর
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য থাকেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়। একইভাবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হয় এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
আগে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদের সদস্যরা তাকে নির্বাচিত করেন।
একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং অন্য একজন তা সমর্থন করেন। একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সর্বাধিক ভোট পাওয়া ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সমান ভোট হলে সংবিধান অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা
রাষ্ট্রপতির আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্ট-এ। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ বেতন আয়করমুক্ত। সর্বশেষ ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতির বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা।
প্রধানমন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। তবে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নিলে সাধারণভাবে তিনি রাষ্ট্রপতির মতো সরকারি সুবিধা পান না। রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরও সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য কিছু সরকারি সুবিধা বহাল থাকে।
রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্য বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে এবং এই ব্যয়ের নিরীক্ষা করা হয় না।
বঙ্গভবন, গাড়ি ও সরকারি সুবিধা
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। ভবনটির সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়। সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহনসুবিধা দেওয়া হয়। সরকারি কাজে বিদেশ সফরের সময় সরকার নির্ধারিত হারে ভাতাও তিনি পান।
বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল
রাষ্ট্রপতির জন্য স্বেচ্ছাধীন তহবিল রয়েছে। বছরে এই তহবিলের পরিমাণ ২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ অর্থ ব্যয় করা যায়।
রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তারা বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।
রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্য বিমাসুবিধা রয়েছে, যার বর্তমান পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এই সুবিধার পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ বেতনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির বাসভবন, গাড়ি, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসহ দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ব্যক্তি হলেও সরকারের প্রধান নন। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
সংসদে কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানের পদটির সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় তার নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। রাষ্ট্রপতির প্রধান ভূমিকা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা; আর সরকারের কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স